বাংলাদেশে সরকারি চাকরির মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল বাহিনী। চাকরিপ্রার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও পুলিশের বেতন, ভাতা ও পদোন্নতি ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে অনেকেই জানতে চান নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল ২০২৬ সালে কত টাকা বেতন পান?, পুলিশের বিভিন্ন পদের বেতন কত? এবং পুলিশে পদোন্নতি কীভাবে হয়?
এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পুলিশ বেতন কাঠামো, কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত বেতন তালিকা, ভাতা ও সুবিধা, এবং পদোন্নতি ব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
পুলিশ কনস্টেবলের বেতন এবং ভাতা বিস্তারিত
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত একজন পুলিশ কনস্টেবল ১৭তম গ্রেডে বেতন পেয়ে থাকেন। ২০২৬ সালেও বাংলাদেশ পুলিশের বেতন কাঠামো জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর উপর ভিত্তি করে চলছে। নতুন পে স্কেলের প্রস্তাব চলছে কিন্তু এখনো গেজেট হয়নি। চলুন দেখি পুলিশের বেতন-ভাতা নিয়ে বিস্তারিত।
- মূল বেতন: যোগদানকালে ৯,০০০ টাকা (স্কেল: ৯,০০০ – ২১,৮০০ টাকা)।
- প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট: মূল বেতনের ৫% যোগ হয় যতক্ষণ না স্কেলের সর্বোচ্চ লিমিটে পৌঁছায়।
ভাতাগুলো বিধি মোতাবেক পাওয়া যায়। এগুলো মিলিয়ে শুরুর দিকে মোট বেতন অনেকটা বাড়ে। বিস্তারিত ভাতা:
- বাড়ি ভাড়া ভাতা: এলাকাভিত্তিক। অবিবাহিতদের জন্য মূল বেতনের ২০-৪০% বিবাহিতদের জন্য ৪০-৬৫% পর্যন্ত। ঢাকা বা বড় শহরে বেশি গ্রামাঞ্চলে কম। শুরুতে সাধারণত ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়।
- চিকিৎসা ভাতা: মাসিক ১,৫০০ টাকা।
- ঝুঁকি ভাতা: পুলিশের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য ১,৫০০ টাকা।
- ধোয়াই এবং চুল কাটা ভাতা: ৮৫ থেকে ৩০০ টাকা।
- টিফিন বা ট্রাভেলিং ভাতা: ২০০ টাকা পর্যন্ত।
- অস্ত্র ভাতা: ১০০ টাকা।
- বিশেষ সুবিধা ভাতা: ১,০০০ টাকা।
- রেশন সুবিধা: খাদ্যসামগ্রী সস্তায় পাওয়া যায় যা আর্থিক সুবিধা দেয়।
- অন্যান্য: উৎসব ভাতা (বছরে দুইবার মূল বেতনের সমান) এবং কিট মেইনটেন্যান্স ভাতা ইত্যাদি।
যোগদানের প্রথম দিকে ভাতা মিলিয়ে আনুমানিক মাসিক বেতন ১৫,০০০ থেকে ১৬,৫০০ টাকার মতো হয়। অভিজ্ঞতা বাড়লে এবং ইনক্রিমেন্ট যোগ হলে এটা বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম বছরেই ১৬,০০০ টাকার আশেপাশে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন পদ ও গ্রেড ভিত্তিক বেতন তালিকা ২০২৬
কনস্টেবল থেকে শুরু করে পুলিশ প্রধান পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন স্কেল ও গ্রেডের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| পদবি | গ্রেড/পদমর্যাদা | আনুমানিক মূল বেতন |
| আইজিপি (IGP) | সিনিয়র সচিব | ৮২,০০০/- টাকা (নির্ধারিত) |
| অতিঃ আইজিপি (Addl. IGP) | গ্রেড-১ | ৭৮,০০০/- টাকা (নির্ধারিত) |
| ডিআইজি (DIG) | ৬৬,০০০/- টাকা (নির্ধারিত) | |
| অতিঃ ডিআইজি (Addl. DIG) | ৫৬,৫০০/- টাকা (নির্ধারিত) | |
| এসপি (Superintendent of Police) | ৪৩,০০০/- টাকা (শুরু) | |
| অতিরিক্ত এসপি (Addl. SP) | ৩৫,০০০/- টাকা (শুরু) | |
| সিনিয়র এএসপি (Sr. ASP) | ২৯,০০০/- টাকা (শুরু) | |
| এএসপি (ASP) | ৯ম গ্রেড | ২৩,১০০/- টাকা (শুরু) |
| পরিদর্শক (Inspector) | ৯ম গ্রেড | ২২,০০০/- টাকা (শুরু) |
| সাব ইন্সপেক্টর/সার্জেন্ট (SI/Sergeant) | ১০ম গ্রেড | ১৬,০০০/- টাকা (শুরু) |
| এএসআই/এটিএসআই (ASI/ATSI) | ১৪তম গ্রেড | ১০,২০০/- টাকা (শুরু) |
| নায়েক (Naik) | ৯,৭০০/- টাকা (শুরু) | |
| কনস্টেবল (Constable) | ১৭তম গ্রেড | ৯,০০০/- টাকা (শুরু) |
Police Monthly Salary in Bangladesh 2026
আরও বিস্তারিত তথ্য দেখুন নিম্নে দেওয়া ছবিতে –

বাংলাদেশ পুলিশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা
বাংলাদেশ পুলিশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ বাহিনীর প্রধান কাজ হলো অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন, অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, জনগণের জানমাল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখা। থানাভিত্তিক পুলিশিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিকট সেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পুলিশ আধুনিকায়নের দিকে এগিয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমে গুরুত্ব দিয়েছে। সিআইডি, ডিবি, র্যাব, এন্টি টেররিজম ইউনিট ও শিল্প পুলিশসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের মাধ্যমে জটিল ও স্পর্শকাতর অপরাধ দমন সহজ হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় এই ইউনিটগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।
জনবান্ধব পুলিশিং ধারণাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পুলিশ এখন জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে, যা অপরাধ প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্ব, ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
পুলিশ চাকরির অন্যান্য সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জ
বেতন ছাড়াও পুলিশের চাকরিতে রয়েছে রেশন, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং সম্মান। কিন্তু কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘ সময় ডিউটি করতে হয়। শুরুতে বেতন কম মনে হলেও ভাতা এবং সুবিধা মিলিয়ে পরিবার চালানো সম্ভব। অভিজ্ঞতা বাড়লে আয় ভালো হয়।
যারা পুলিশে যোগ দিতে চান তাদের জন্য পরামর্শ নিয়মিত police.gov.bd ওয়েবসাইট ভিজিট করুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জন্য। শারীরিক ফিটনেস এবং মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।
পুলিশে পদোন্নতির নিয়ম এবং প্রক্রিয়া
পুলিশে পদোন্নতি সময়মতো এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়। এটা পরীক্ষা, পারফরম্যান্স এবং সার্ভিস রেকর্ডের উপর নির্ভর করে। বিস্তারিত:
- কনস্টেবল থেকে নায়েক: চাকরির ৩ বছর পূর্ণ হলে এবং চাকরি কনফার্ম হলে পরীক্ষা দিয়ে পদোন্নতি পাওয়া যায়। এতে সার্ভিস বুক, প্যারেড এবং মাঠ পরীক্ষা দেখা হয়।
- নায়েক থেকে এএসআই: চাকরির ৬ বছর পূর্ণ হলে লিখিত পরীক্ষা (আইন বিষয়ক নৈর্ব্যক্তিক এবং লিখিত), প্যারেড এবং ভাইভা দিয়ে পদোন্নতি।
- উচ্চপদে: বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের মাধ্যমে বা ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষায় এএসপি থেকে উপরে উঠা যায়।
একজন কনস্টেবল ধাপে ধাপে যোগ্যতা দেখিয়ে সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (এসপি) পর্যন্ত উঠতে পারেন। পদোন্নতি পেলে বেতন এবং সুবিধা অনেক বাড়ে।
FAQ: Police Monthly Salary in Bangladesh 2026 (বাংলাদেশ পুলিশ বেতন ও ভাতা)
২০২৬ সালে একজন পুলিশ কনস্টেবল কত গ্রেডে বেতন পান?
২০২৬ সালে একজন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল ১৭তম গ্রেডে বেতন পেয়ে থাকেন, যা জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত।
পুলিশ কনস্টেবলের যোগদানকালীন মূল বেতন কত?
আনুমানিক সর্বমোট মাসিক বেতন প্রায় ১৬,২৮৫/- টাকা। (মূল বেতন ৯,০০০ টাকা + বাড়ি ভাড়া ৪৫০০ টাকা (সর্বনিম্ন ৫০%) + ধোলাই/চুলকাটা ভাতা ৮৫ টাকা + ট্রাভেলিং এলাউন্স ২০০ টাকা + চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকা + বিশেষ সুবিধা ১০০০ টাকা)।
পুলিশ কনস্টেবল কোন কোন ভাতা পেয়ে থাকেন?
একজন পুলিশ কনস্টেবল নিম্নলিখিত ভাতাগুলো পেয়ে থাকেন:
১. বাড়ি ভাড়া ভাতা ২. চিকিৎসা ভাতা ৩. ঝুঁকি ভাতা ৪. বিশেষ সুবিধা ভাতা ৫. অস্ত্র ভাতা ৬. ধোলাই ও চুলকাটা ভাতা ৭. টিফিন ভাতা ৮. রেশন সুবিধা ৯. উৎসব ভাতা (বিধি মোতাবেক) এছাড়া তিনি বিধি মোতাবেক ট্রাভেলিং এলাউন্স, কিট ভাতা এবং স্কিলড ভাতাও পেয়ে থাকেন।
পুলিশের বেতন কি প্রতিবছর বাড়ে?
হ্যাঁ। সরকারি বেতন কাঠামো অনুযায়ী পুলিশের মূল বেতনের সাথে প্রতি বছর ৫% হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়।
কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতি পেতে কত বছর লাগে?
একজন পুলিশ কনস্টেবল সাধারণত ৬ বছর চাকরি সম্পন্ন হলে এএসআই পদে পদোন্নতির পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেন।
পুলিশে পদোন্নতির পরীক্ষা কীভাবে হয়?
পুলিশে পদোন্নতির জন্য লিখিত আইন পরীক্ষা, নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা, প্যারেড, মাঠ পরীক্ষা ও ভাইভা নেওয়া হয়। সার্ভিস রেকর্ডের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করা হয়।
পুলিশের বিভিন্ন পদের যোগদানকালীন মূল বেতন কত?
বাংলাদেশ পুলিশে বিভিন্ন পদের যোগদানকালীন মূল বেতনগুলো হলো:
আইজিপি (ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ) – ৮২,০০০/- টাকা (সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা), ডিআইজি (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল) – ৬৬,০০০/- টাকা, এসপি (পুলিশ সুপার) – ৪৩,০০০/- টাকা, পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) – ২২,০০০/- টাকা, সাব ইন্সপেক্টর/সার্জেন্ট/টিএসআই – ১৬,০০০/- টাকা, এএসআই (অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর)/এটিএসআই – ১০,২০০/- টাকা, নায়েক – ৯,৭০০/- টাকা, এবং কনস্টেবল – ৯,০০০/- টাকা।
কনস্টেবল থেকে নায়েক পদে পদোন্নতির জন্য কত বছর চাকরি করতে হয়?
চাকুরির বয়স ০৩ বছর পূর্ণ হলে এবং চাকরি কনফার্ম হলে নায়েক পদে পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন।
একজন কনস্টেবল পদোন্নতি পেয়ে সর্বোচ্চ কোন পদ পর্যন্ত যেতে পারেন?
একজন কনস্টেবল পদোন্নতি পেয়ে এসপি (পুলিশ সুপার) পর্যন্ত হতে পারেন।
শেষকথা
২০২৬ সালে বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি একটি সম্মানজনক, স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার সুযোগ প্রদান করে। যদিও শুরুতে বেতন তুলনামূলক কম মনে হতে পারে তবে নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, রেশন সুবিধা, পদোন্নতি এবং সামাজিক মর্যাদার কারণে পুলিশ চাকরি অনেকের জন্য একটি আকর্ষণীয় পেশা।
এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা Police Monthly Salary in Bangladesh 2026, পুলিশ কনস্টেবল বেতন, পুলিশ বেতন কাঠামো ও পদোন্নতি ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

Informative post! 👍